Sunday, 17 January 2021

রাজস্থান ভ্রমণ ডায়েরীর দ্বিতীয় পর্ব-সোনার শহর জয়শলমীর।

দ্বিতীয় পর্ব।                                                    জয়শলমীরের দর্শনীয় স্থানগুলো - 1)সোনার কেল্লা ,2)গদীসার লেক,3) নাথমলজী কী হাভেলী,4) পাটওয়া কী হাভেলী 5) বড়া বাগ ইত্যাদি দেখে রাজস্থানী শিল্প- সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করার চেষ্টা করি।                               26শে ডিসেম্বর, ভোর পাঁচটায় জয়শলমীর স্টেশনে এসে পৌঁছোলাম,বাইরে খুব ঠান্ডা।স্টেশনের ফুটব্রীজ থেকে আলোশোভিত সোনার কেল্লার প্রথম দর্শন হলো। আমরা জয়শলমীর ঘোরা ও সাম ডিউনে রাত্রি বাসের জন‍্য কলকাতা  থেকেই এক এজেন্ট  নারায়ণের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম, তার  পাঠানো ব‍্যাক্তি গাড়ী নিয়ে স্টেশনের বাইরে অপেক্ষা করছিলো।হোটেলে পৌঁছে একটু ফ্রেশ হয়ে নিয়ে সকালের শহরের রূপ অবলোকন করতে পায়ে হেঁটে বেড়িয়ে পরেছিলাম।  1156 সালে রাজা জয়সল এটি  প্রতিষ্ঠা করে। তার নাম অনুসারেই এই শহরের নাম হয় জয়শলমীর।ছোট শহর,যেটা একটা প্রধান  রাস্তাকে কে্ন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। কোর্ট, ডি এমের‌ বাংলো …..ইত্যাদি সবই একই রাস্তার উপর পাশাপাশি অবস্থিত। স্বাধীন ভারতবর্ষের  1965 ও 1971 -এর ইন্দো-পাক যুদ্ধের সময় সীমান্তকে দৃঢ় ও সুরক্ষিত করতে দ্রুতগতিতে রেল ও সড়ক গড়ে ওঠে জয়শলমীরে। মরুভূমির বুক চিরে  ভারত সীমান্ত অবধি চলে  গেছে প্রশস্ত ও ঝাঁ-চকচকে হাইওয়ে। এখানকার বাড়ি, হোটেল, সরকারি ভবন প্রায় সবই হলুদ পাথরের তৈরী এবং অন্ততঃ সামনের দিকটা বিখ্যাত জারোখা ও সূক্ষজালির কারুকার্য দিয়ে অলংকৃত।সত্যিই যেন এ এক সোনার শহর। এরপর আমরা রাজস্থানী প্রাতঃরাশ সেরে জয়শলমীর শহর দেখা শুরু করলাম, আমাদের সারথী রেখা আর তার বোলেরোর সহায়তায়।    1)  সোনার কেল্লা-–জয়শলমীরের প্রধান আকর্ষণই হলো সোনার কেল্লা।প্রসিদ্ধ লেখক ও পরিচালক সত‍্যজিত রায়ের 'সোনার কেল্লা' গল্পের বই ও সিনেমা এটিকে আপামর জনতার কাছে আরো বিখ্যাত ও জনপ্রিয় করে তুলেছে।প্রধানতঃ বাঙালীরা এই কেল্লা ও মরুভূমিতে সূর্যাস্ত দেখার জন‍্যই এখানে ভীড় জমায়। ত্রিকূটপাহাড়ের উপর অবস্থিত এই দুর্গ' সোনার কেল্লা' ঘিরেই গড়ে উঠেছে এই শহর।এই দুর্গের প্রায় পুরোটাতেই লোকজনের বাস। বিভিন্ন জিনিসের দোকান, হোটেল, বাজার সবই আছে এখানে, কিছুটা অংশকে মিউজিয়াম বানিয়ে সাধারণ জনতার কাছে কেল্লা দেখার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।টিকিট ছিল জনপ্রতি ১০০টাকা আর ক‍্যামেরার জন্যও ছিল ১০০টাকা। সমতল থেকে আশি মিটার উচ্চতায় হলুদ বেলে পাথরের তৈরী এই দুর্গ।পাথরের সর্পিলাকার পথ দিয়ে অক্ষয়পোল, সূরজপোল অর্থাৎ গেট পেরিয়ে সিটি প‍্যালেস চকে পৌঁছানো যায়। এই পাঁচ মহলা,সাততলা ছত্রাকার সিটি প‍্যালেসেই এখন মিউজিয়াম হয়েছে। খোলা থাকার সময় 8a.m  -5p.m. সিটি প‍্যালেস থেকে অলি-গলি পেরিয়ে এসে পৌঁছোলাম হলুদ পাথরে তৈরী অসংখ্য সূক্ষ্ম কারুকার্যমন্ডিত জৈন মন্দিরে। মন্দিরে আছে ঋষভনাথ,শান্তিনাথ ও সম্ভনাথের মূর্তি ।মন্দিরের লতাপাতার অলংকরণ  যেন পাথরের পরিবর্তে কাগজের উপর হয়েছে বোধ হচ্ছে। তবে সিটি প‍্যালেসের উপর থেকে হলুদ পাথরে মোড়া মরুশহর দেখতে  সত্যিই অতুলনীয়।।                 2) গদীসার লেক কেল্লা থেকে বেড়িয়ে আমরা  আর এক আকর্ষণীয় দ্রষ্টব্য গদীসার লেকের জন্য রওনা দিলাম। কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণীর বইয়ের জলসংরক্ষণ পাঠে এই লেকের সম্বন্ধে বিস্তারিতভাবে দেওয়া আছে।বছরের পর বছর সেই পাঠ‌ পড়ানোর পর স্বাভাবিকভাবেই তা দেখার অন‍্যরকম এক ইচ্ছা থাকে। এটি নটা লেকের সম্বন্বয়ে তৈরী।বৃষ্টির সময় এক লেক ভরে গেলে জল পরবর্তী লেককে ভরিয়ে দিত,এইভাবে বিশাল জলরাশি সংরক্ষণ করে রাখা হতো।সুন্দর কারুকার্যময় তোরণ দিয়ে  প্রবেশ।তারপর চারপাশ ঘিরে অনেক মন্দির নির্মাণ হয়েছে। বোটিং এর ব‍্যবস্থা আছে।শীতের দিনে জলচর পাখীরা ভেসে বেড়ায় এই লেকের জলে।আর আছে বড়ো বড়ো মাছ, খাবার খাওয়ার জন্য দর্শনার্থীদের সামনে চলে আসে।                      3) পাটওয়া  কী হাভেলী আর নাথমলজী কী হাভেলী–--সেই সময়কার দুই ধনী ব‍্যবসাদারের বাড়ী। জয়শলমীরের  অন‍্যতম আকর্ষণ পাথর কুঁদে তৈরী সুক্ষ জাফরীর কারুকাজ এই হাভেলীগুলো খুব সুন্দরভাবে বহন করে চলেছে।  সুন্দর ম‍্যুরালে অলংকৃত অলিন্দ ও দেওয়াল, গিলটি করা সিলিং,তাদের ব‍্যবহৃত বিভিন্ন দামী ও সৌখীন  আসবাবপত্র, তৈজসপত্র ইত্যাদি মিউজিয়াম হিসাবে সাজিয়ে রেখেছে। নাথমলজী কী হাভেলী ঠিক পাটওয়া কী হাভেলীর পাশেই দাঁড়িয়ে আছে।প্রত‍্যেকটিতে প্রবেশ অনুমতি পত্র( টিকিট) জনপ্রতি একশো টাকা আর ক‍্যামেরার চার্জও একশো টাকা।                                  4)বড়া বাগ- জয়শলমীরের রাজাদের দেবল আছে এই বড়াবাগে।                                                  এরপর আমরা হোটেলে ফিরে ফ্রেশ হয়ে দুপুরের খাবারটা খেয়ে নিই।পুরো রাজস্থান ভ্রমণে সবচেয়ে সুস্বাদু খাবার আমরা এখানে খেয়ে ছিলাম।
(রাজস্থানের প্রসিদ্ধ  ব্লক প্রিন্টের ডাইস। এই ডাইসগুলো হোটেলের ঘরের দেওয়াল সজ্জাও করা হয়েছে আর  রাজস্থানী পুতুলের তো পৃথিবীব‍্যাপী খ‍্যাতি।)

Sunday, 10 January 2021

রাজস্থান ভ্রমণ ডায়েরী - প্রথম পর্ব।

 আমরা  ন'দিনের ট‍্যুরে রাজস্থান  গিয়েছিলাম। ছুটি  কম থাকায় খুব দৌড়ে  দৌড়ে  নিজেরাই এই ট‍্যুরটি  করেছিলাম।অবশ‍্যই বর্তমান পত্রিকা  ও ইন্টারনেট যুগের  কাছে আমরা কৃতজ্ঞ।  এই  ব্লগ পড়ে যদি কোনো ট্রাভেলারের উপকার হয় তাই যাতায়াত আর থাকা পর্বটি একটু বিস্তারিতভাবে  লিখলাম।                                                          1) 2016 সালের25শে ডিসেম্বর সকালের বিমানে দিল্লী পৌঁছে আবার  ওখান থেকে দুপুর বারোটার জয়পুরগামী বিমানে জয়পুর পৌঁছে বিকেল চারটের নীলম এক্সপ্রেসে চেপে ভোরবেলায়          ( 26শে ডিসেম্বর)  জয়শলমীর পৌঁছায়।                                         2) 26শে ডিসেম্বর সকাল থেকে  জয়শলমীর ঘুরে  বিকেলে চলে যাই সাম্ ডিউন।                    3) 27শে ডিসেম্বর জয়শলমীর থেকে  সকালের যোধপুর  এক্সপ্রেস ধরে বিকেলে যোধপুর  পৌঁছোয়। পরেরদিন( 28শে ডিসেম্বর ) যোধপুর ঘুরে  রাত্রে উদয়পুর যাওয়ার  বাস ধরে  সকালে উদয়পুর পৌঁছোয়।                                4) 29শে ডিসেম্বর উদয়পুর ঘুরে রাত্রে আজমীর যাওয়ার ট্রেন ধরে  রাত তিনটেয় আজমীর পৌঁছায়।                                                              5 ) 30শে ডিসেম্বর  সারাদিন  আজমীর ও পুষ্কর  দেখে নিই।                                                          6) 31শে ডিসেম্বর  সকালে  ট্রেন ধরে  ফিরে আসি জয়পুরে। 31শে ডিসেম্বর  ও পয়লা জানুয়ারি  জয়পুরে কাটিয়ে সেকেন্ড /দোসরা জানুয়ারি দিল্লী হয়ে  বিমানে আবার  কলকাতা ফিরে আসি।   প্রথম  পর্ব  -  ২৪শে ডিসেম্বর,2016সাল অবশেষে আমরা কলকাতা নেতাজী সুভাষচন্দ্র বিমানবন্দরে  এসে পৌঁছলাম অনেক আকাঙ্ক্ষিত ৯দিনের রাজস্থান ভ্রমণের জন্য। প্রথমেই অবশেষে লিখলাম কারণ এর আগে বেশ কয়েকবার যাবার পরিকল্পনা ভন্ডুল করতে হয়েছে আমার পতিদেবের জরুরী কাজ পরে যাওয়ায়।২০০৭-এ তো আসা-যাওয়ার টিকিট, হোটেল বুকিং-এর পরও  ট্রিপটা ক‍্যান্সেল করতে হয়।মন খারাপের সাথে  কিছু অর্থ গচ্ছাও যায়।যাইহোক আমরা রাত্রে সাড়ে নটায় পলতা থেকে বেরিয়ে লোকাল ট্রেনে দমদম স্টেশন পৌঁছে এক ওলা ক‍্যাবে চড়ে বিমানবন্দরের টার্মিনাল ২, গেট নং ৩-এ গিয়ে পৌঁছালাম।আমাদের  বিমান যাত্রার সময় ছিল সকাল সাতটায়, সেইজন্য  রাত বারোটার পরই আমাদের লাউঞ্জে ঢুকতে দিল।ঠিক  সেই মুহূর্তে আমি 1974 -এ পিছিয়ে গেছিলাম,  ডিসেম্বরে বাবা -মা এর সাথে আমি,ভাই ও প্রিন্স( আমার বাবার মামাতো ভাই) বিমান বন্দরে বিমানদের রানওয়েতে খুব জোরে দৌড়ে আকাশে উড়ে যাওয়া এবং দৌড়ে অবতরণ করা দেখতে এসেছিলাম।অবাক চোখে খুব আনন্দের সাথে দেখে বাড়ী ফিরেছিলাম।রানওয়েটা লোহার রেলিং দিয়ে ঘেরা থাকায়  বাইরে থেকে প্লেনের ওঠানামা দেখা যেত।বিমানে চড়তে না পাওয়ার দুঃখ ছিল না, তবে মনের মধ্যে একটা ইচ্ছে -সাধ তো ছিলোই আকাশে উড়ার অনুভূতিটা পাওয়া। আমার স্বামী বিগত কয়েক বছর ধরেই এই অভিজ্ঞতায় অভিজ্ঞ হলেও আজ  আমার ছেলে ও আমার সেই সাধপূরণের দিন।লাউঞ্জে ঢুকে ব‍্যাগপত্র এক বসার জায়গার কাছে রেখে ভেতরটা ঘুরে দেখতে লাগলাম ও কিছু ফটো তুলে আবার স্বস্থানে ফিরে এসে বাড়ী থেকে নিয়ে আসা খাবার গুলো উদরস্থ করলাম।ব‍্যাগপত্র গুছানো, ঘরদোরের ঠিকমতো ব‍্যবস্থা করা ইত্যাদি শ্রমজনিত কারণে চেয়ারে বসে বসেই একটু ঝিমুনি এসেছিল, কিন্তু হঠাৎ শোরগোলের আওয়াজে চোখ খুলে দেখি ভোর চারটে আর আমার সামনে লাগেজ হাতে যাত্রীদের বিশাল লাইন।আমার পতিদেব উদয়নও লাগেজের ওজন ও সিকিউরিটি চেকআপের জন্য গিয়েছে। আমাদের চেকিং এর সব ফর্মালিটিস পূরণ করে  সেই বাসটিতে চেপে বসলাম, যেটি আমাদেরকে AIR INDIA-763 কাছে নিয়ে এলো।।নির্ধারিত আসনে বসে অপেক্ষা করতে লাগলাম।শীতের সকাল কুয়াশাচ্ছন্ন হওয়ায় প্লেন ছাড়তে দেরী হচ্ছিল।অবশেষে আবহাওয়া পরিষ্কার ও রৌদ্রোজ্জ্বল হওয়ার পরে আমাদের প্লেনটাও একছুটে আকাশে উড়ে গেল।আমরা এখন মেঘের উপর দিয়ে উড়ছি,মনে হচ্ছে যেন আমার চারপাশে তুলো উড়ছে।জানালা দিয়ে তার কিছু ফটো নিলাম।পাইলটের ঘোষণা অনুসারে আমরা কখনো 27000 ft আবার কখনো বা 36000 ft উপর দিয়ে উড়ছিলাম। মেলায় উঁচু ইলেকট্রিক নাগরদোলা থেকে নীচে নামার সময় যে অভিকর্ষহীন অনুভূতিটা হয়, সেরকম লাগছিল।সকাল 9:20তে প্লেনটি  ভূমি স্পর্শ করলেও আমরা দিল্লী এয়া‌রপোর্ট পৌঁছলাম 9::35a.m।জয়পুরের প্লেনের সময় 12টা হওয়াতে একটু কিছু খেয়ে নিয়ে আমরা দিল্লী বিমানবন্দর ও তার দোকানপত্রগুলো ঘুরে দেখে নিলাম।এটি তার পরিমাপ,সাজসজ্জা, ডিউটি ফ্রী শপ  সবেতেই কোলকাতার থেকে অনেক আলাদা।আসলে দেশের রাজধানীর বিমানবন্দর ,ভালো তো হবেই।  আবার দিল্লী থেকে রওয়ানা দিয়ে12:55 তে জয়পুর পৌঁছে গেলাম ।একটা ওলা ক‍্যাব বুক করে জয়পুর- জয়সলমীর ট্রেন (নীলম  এক্সপ্রেস) ধরার জন্য জয়পুর স্টেশনে এসে পৌঁছলাম (12কিমি)। IRCTC  র ক‍্যান্টিনে দুপুরের খাবার খেয়ে ট্রেনে চেপে বসলাম এবং ঠিক বিকেল চারটেয় এটি তার গন্তব্যে  পৌঁছনোর জন্য নড়ে উঠলো।সহযাত্রীরা প্রায় সকলেই ছিলেন আমাদের মতন পর্যটক।

রাজস্থান ভ্রমণ- দশম তথা অন্তিম পর্ব।

রাজস্থান ভ্রমণ- দশম তথা অন্তিম পর্ব। জয়পুর শহর ভ্রমণ। 1st জানুয়ারি,2017. 1লা জানুয়ারি  আমরা ঠিক 8:45-এ RTDC-র তীজ হোটেলে, আমাদের কবীর মার্গে...