আমি ঘুরতে খুব ভালোবাসি। এটা আমার বাবার কাছ থেকে বোধ হয় উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। বাবা ,প্রায় প্রতি বছর দুর্গাপুজোর সময় অথবা বার্ষিক পরীক্ষার শেষে ডিসেম্বর মাসে কখনো কাছে পিঠে কোথাও ,কখনো বা দূরের কোনো রাজ্যের জায়গা গুলি ঘোরাতে নিয়ে যেতেন। বিয়ের পর আমার স্বামীরও বদলির চাকরি হওয়াতে বিভিন্ন জায়গায় ঘোরার সুযোগ পেয়েছি। আমি সেগুলিকে এখানে পর্যায়ক্রমে চিত্র সহযোগে লিখতে চলেছি। যাতে পাঠক কুলও এই জায়গা সম্বন্ধে জানতে পারেন এবং এই জায়গার বিভিন্ন দর্শনীয় জায়গা দেখার আনন্দ উপভোগ করতে পারেন।
Monday, 29 March 2021
রাজস্থান ভ্রমণ- ষষ্ঠ পর্ব।
উদয়পুর শহর পরিক্রমা। 29শে ডিসেম্বর,2016. ভোর সাড়ে চারটের সময় আমরা উদয়পুর বাসস্ট্যান্ডে এসে বাস থেকে নামলাম। আবহাওয়া ভীষণ ঠান্ডা আর লোকজন তেমন নেই বলা চলে। আমাদের যোধপুরের হোটেলটা OYO থেকে বুকিং করেছিলাম,চারতলায় ঘর দিয়েছিল আর লিফ্ট ছিল না। দূর্গের উঁচু উঁচু সিঁড়িগুলো দিয়ে ওঠানামা করে এমনিই হাঁটু ব্যথা শুরু হয়ে গেছিল আমরা ঘরটা পরিবর্তন করে দিতে বললে, হোটেল কর্তৃপক্ষ রাজী হয় নি। যাইহোক একদিনের ব্যাপার তো মানিয়ে নিয়েছিলাম। তবে একটা শিক্ষা পেয়েছিলাম ঘর বুক করার সময় কত তলায়,লিফ্ট আছে নাকি এসবও দেখে নিতে হবে। এইসব ভেবে উদয়পুরের জন্য আর অনলাইন হোটেল বুক করা হয় নি।খবর নিয়ে জেনেছিলাম বাসস্ট্যান্ডের কাছাকাছি আমাদের পছন্দমাফিক অনেক ভালো হোটেল আছে আর স্পটে গিয়ে দেখেশুনে পাওয়াও যায়। সুতরাং একটু বসে এক কাপ চায়ে শরীর গরম করে আমার পতিদেব হোটেলের খোঁজে বেরোলেন আর তখন মোটামুটি লোক চলাচল শুরু হয়ে গিয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাসস্ট্যান্ডের কাছেই এক হোটেলের ঘরে গিয়ে আজকের মতো আস্তানা গাঁড়লাম। ছোট করে একটা ঘুমও দিয়ে নিলাম। এবার আবার ঐতিহাসিক শহর উদয়পুর দেখতে যাওয়ার পালা। আমার কলেজে পড়া ছেলে এই ঠাণ্ডায় আর নরম কম্বলের ভেতর থেকে বেরোতে চায়ছে না। আসলে আমাদের শীতের ছুটি দশদিনের তারমধ্যে ডিমানিটাইজেশনের কারণে একদিন বিমানের টিকিট কাটতে গিয়ে অসুবিধায় পড়া হয় । পরদিন গিয়ে 24-এর পরিবর্তে 25শে ডিসেম্বরের টিকিট পায় মানে বেড়ানোর দিন একদিন কেটে নয়দিন হয়ে গেল আর তার ফলস্বরূপ চিতোরগড় এযাত্রায় আমাদের লিস্ট থেকে বাদ গেল। এই হেক্টিক সিডিউলের সাথে মানাতেই হবে নতুন কিছুর সাথে পরিচিত হতে গেলে। সুতরাং স্নান - ব্রেকফাস্ট সেরে তাড়াতাড়ি এক সরোবরের শহর বা বলতে পারি লেক অফ্ টাউন উদয়পুর পরিক্রমায় বেড়িয়ে পড়লাম। মাথার ওপরে রোদ ঝলমলে নীল আকাশ আর নীচে বড়ো বড়ো সুসজ্জিত সরোবর। আবহাওয়া খুবই মনোরম। স্থপতি শিশোদিয়া মহারাজ উদয় সিং -এর নামানুসারেই এই শহরের নাম উদয়পুর। 1) প্রথমেই আমরা দেখতে গেলাম রাণা প্রতাপ মেমোরিয়াল। রাণা প্রতাপ ও তার সহচর চৈতককে তো আমরা সেই ছোটবেলা থেকে ইতিহাস বই আর দাদু - ঠাকুমার গল্পে চিনি। মহারাণা প্রতাপ আপামর ভারতীয়ের কাছে বীরত্ব ও সাহসিকতার প্রতীক। এই মেমোরিয়ালের পেছনে এক পুরোনো রাজপ্রাসাদের ধ্বংসাবশেষও দেখেছিলাম।। (স্মৃতিটুকু থাক।) 2) ফতেহ্ সাগর লেক- অপ্রতুল বৃষ্টি হওয়ার দেশে এই লেকগুলো যেন জীওনকাঠি। আগেকার দিনের প্রজাবৎসল ও দূরদর্শী রাজা-মহারাজারা সারাবছরের বৃষ্টির জল সঞ্চয় করে রাখার জন্য এইরকম লেক খনন করতেন।আবার এই বিস্তৃত জলরাশি পরিবেশকেও ঠান্ডা রাখত। টিকিট কেটে, জীবন রক্ষামূলক জ্যাকেট পরে ও যন্ত্রচালিত নৌকা চেপে লেকের মাঝখানে অবস্থিত এক সুন্দর বাগানে গিয়ে পৌঁছেছিলাম। চারপাশ ঘুরে ও সুন্দর সুন্দর ফাউন্টেনের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে আবার নৌকা করেই ফিরে এসেছিলাম। (আরাবল্লী পর্বতের গা ঘেঁষে ফতেহ্ সাগর লেক।) ( লাইভ সেভ জ্যাকেট গায়ে ফতেহ্ সাগর লেকের যন্ত্রচালিত নৌকায়।) 3) ভারতীয় লোককলা মন্ডল- এইটি রাজস্থানী শিল্পকলা, সংস্কৃতি ইত্যাদি জনসাধারণের কাছে তুলে ধরার এক কেন্দ্র। এখানে রাজস্থানী জুয়েলারি, বস্ত্র, বিছানার চাদর ইত্যাদির সঙ্গে আদিবাসী মানুষের ছবি, মডেল ইত্যাদিও প্রদর্শিত। তবে আমরা এখানে পুতুল নাটিকা খুব উপভোগ করেছি। 4) সিটি প্যালেস - এর পরের গন্তব্যস্থল ছিল শ্বেত মর্মরে তৈরী সিটি প্যালেস। এইটিরও একভাগ পাঁচতারা হোটেল ও অন্যভাগ মিউজিয়াম।এই প্রাসাদের গায়ে লেগে আছে পিছোলা লেক। হাথী পোল পেরিয়ে,তারপর আটটা আর্চ দিয়ে তৈরী ত্রিপোলিয়া গেটের মাধ্যমে প্রাসাদে প্রবেশ করলাম। ময়ূর চক, মোতিমহল, চিনি চিত্রশালা, শীশমহল, কৃষ্ণমহল, দিলখুস মহল, ভীম বিলাস প্রাসাদ ইত্যাদি এক এক করে প্রাসাদের ভেতর দেখলাম। এর বিশালতা, কারুকার্য, গরিমা সব দেখে যারপরনাই বিস্মিত হতে হয়। পিছোলা লেকের মধ্যেও আছে দুটো প্রাসাদ- জগ মন্দির আর জগ নিবাস(লেক প্যালেস)। তবে এখন তারা পাঁচ তারা হোটেল। (ময়ূর চক)(বিয়ের মন্ডপ -সিটি প্যালেস। দেশ-বিদেশের বিখ্যাত মানুষজনদের বিবাহ কার্য এখানে সম্পন্ন হয়।) (পিছোলা লেকের গা ঘেঁষে সিটি প্যালেস।) পিছোলা লেকের মধ্যে জগমন্দির ও জগ প্যালেস।এদুটিই এখন পাঁচতারা হোটেল। (কার কার বাড়ীতে এখনো এগুলো পাওয়া যাবে?) 5 ) এর পরের গন্তব্য ছিল 'সহেলি-কী-বাড়ী।' রাজামশাই তার রাণীদের স্নানের জন্য বানিয়েছিলেন। এখানের ফোয়ারাগুলো মেঝেতে ঝরে পড়ার সময় বৃষ্টির আওয়াজ সৃষ্টি করতো আর সেই রিমঝিম শব্দ শুনে রাণীরা আনন্দে নৃত্য করতেন কারণ প্রাকৃতিকভাবে বৃষ্টি তো ওখানে অনেক কম হতো। খুব সুন্দর জায়গা। (সহেলী কী বাড়ীতে শ্যুটিং চলছে।) ..সিটি প্যালেস, লেক প্যালেস, সহেলী-কী-বাড়ী ইত্যাদি অনেক বিখ্যাত হিন্দী সিনেমায় আমরা দেখেছি।কিন্ত একটারও নাম মনে করতে পারছিলাম না। ভাবছিলাম আমার বাবা আজ আমার সাথে থাকলে সব এক এক করে বলে দিত। তারপর আবার হোটেলে ফিরে আসা আর খানিকক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার পরবর্তী গন্তব্য আজমীর যাওয়ার জন্য স্টেশনে আসা।
Wednesday, 17 March 2021
রাজস্থান ভ্রমণের চতুর্থ পর্ব।
চতুর্থ পর্ব - জয়শলমীর থেকে যোধপুর যাওয়ার বিবরণ। 27শে ডিসেম্বর ভোর সাড়ে চারটের সময় তাঁবুর ঘরের নরম গদি ও কম্বল ছেড়ে যোধপুর যাওয়ার জন্য তৈরী হয়ে নিলাম আর পাঁচটার মধ্যে জয়শলমীর স্টেশনের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেলাম।তাঁবুর ঘরের সকালের চা-জলখাবার আর আস্বাদন করা হলো না। আমরা একঘণ্টার মধ্যেই (6টা) স্টেশনে পৌঁছে গেছিলাম। সকাল 6 টা 45 এর জয়শলমীর - যোধপুর এক্সপ্রেসের টিকিট কাটা হলো। এরপর কাল ভোর থেকে যে বোলেরো ও তার সারথী রেখা আমাদের সাথে ছিল তাদেরকে বিদায় জানানো হলো। ড্রাইভার ভদ্রলোক ভীষণই ভদ্র ও সময়ে পাক্কা ছিলেন। ট্রেনটি অবশেষে পোনে সাতটার বদলে সাড়ে সাতটায় স্টেশনের মায়া ত্যাগ করে যোধপুরের দিকে রওনা দিল।জয়শলমীর ভারতবর্ষের একদম পশ্চিম প্রান্তে হওয়ায় শীতকালে সূর্যদেবের দেখা প্রায় সাড়ে সাতটার পর পাওয়া গেল। ট্রেন প্রায় ফাঁকা ছিল। রেললাইনের দুধারে কোনো জনবসতি চোখে পড়ছিল না। প্রায় এক-দেড় ঘন্টা দৌড়ানোর পরে কোনো স্টেশনে এসে আমাদের ট্রেনটা দম নিচ্ছিল। আমাদের সহযাত্রী ছিল দুটি ছোট ফুটফুটে মেয়ে সমেত উত্তরপ্রদেশের এক মিলিটারি পরিবার। তারা চাকুরী সূত্রে জয়শলমীরে থাকে। সেদিন তারা রামবাবার( স্থানীয় ভগবান )কাছে পূজো দিতে যাচ্ছিল। তাদের থেকেও এখানকার জীবিকা-জীবন নিয়ে অনেক ইনফরমেশন পেলাম। বৃষ্টি কেমন হয়,গরমে জলের অভাব হয় নাকি - এইসব আমারও কিছু প্রশ্ন ছিল। তার উত্তরে জানলাম 2016 র বর্ষাকালে একদিন খুব ঝমঝমিয়ে আর একদিন এমন বৃষ্টি হয়েছিল যে মাটিও ভেজেনি।ঘন্টাখানেক পরেই গন্তব্যস্থল এসে পড়ায় তারা নেমে পড়ে।এরপর আমরা এসে পৌঁছায় ভারতের বিখ্যাত পরমাণুপরীক্ষা কেন্দ্র পোখরান স্টেশনে। ট্রেনটি দাঁড়িয়ে থাকার ফাঁকে সিমলা মির্চ ও বেসন দিয়ে তৈরী পকৌড়া খেয়ে জলখাবার পর্ব সমাপ্ত করা হলো। অবশেষে সকাল 11:30 তে ট্রেন পৌঁছাল যোধপুরে। আমরা আগের দিন OYO- এর মাধ্যমে যে হোটেলটি বুক করেছিলাম সেটি যোধপুর স্টেডিয়ামের একদম কাছেই ছিল। হোটেলে পৌঁছে স্নান করে কাছেই এক হোটেলে গিয়ে সুস্বাদু রাজস্থানী থালী দিয়ে লান্চ সাঙ্গ করা হলো।কমপ্লিমেন্টরি কুলফিটাও খুব ভালো ছিল।ওই হোটেলের কাছেই এক বড়ো মেলা চলছিল।আমরাও ঢুকে পড়লাম। এদিকে ওদিকে ঘুরে একটা কুর্তিও কিনে ফেললাম। এখানে সূর্য অস্ত যায় দেরী করে,হাতে এখনো সময় আছে। স্থানীয় লোকজনের কাছে জেনে কাছেই পাহাড়ের ওপর অবস্থিত বীর দূর্গাদাস রাঠোর পার্কে অটো করে ঘুরতে গেলাম। পাহাড়ের ওপর থেকে যোধপুর শহরটা খুব সুন্দর দেখা যায় আর ভালো লেগেছিল পেছনের পাহাড়ের কোলে সূর্যাস্ত। পার্কটির প্রবেশমূল্য ছিল দশটাকা। ওখানে পার্কে ঘুরতে আসা এক পরিবারের সঙ্গে পরিচয় হয়। ফেরার সময় তারা আমাদের গাড়ী করে হোটেলের সামনে নামিয়ে দিয়ে গেছিল। এরপর চা খেয়ে শুরু হলো রাত্রের শহরের রূপ অবলোকন করা।দশটা নাগাদ একদম ডিনার সেরে অস্থায়ী নীড়ে ফেরা। ডায়েরী লিখতে হবে,তারপর কাল সকালে উঠে যোধপুরের বিশেষ দ্রষ্টব্যগুলো দেখতে বেড়োতে হবে।পরের পর্ব যোধপুর ভ্রমণ।
Subscribe to:
Comments (Atom)
রাজস্থান ভ্রমণ- দশম তথা অন্তিম পর্ব।
রাজস্থান ভ্রমণ- দশম তথা অন্তিম পর্ব। জয়পুর শহর ভ্রমণ। 1st জানুয়ারি,2017. 1লা জানুয়ারি আমরা ঠিক 8:45-এ RTDC-র তীজ হোটেলে, আমাদের কবীর মার্গে...
-
তৃতীয় পর্ব। (বালির ওপরে এই বড়ো পোকার দরুণ মূর্ত হওয়া ডিজাইন।) ২৬শে ডিসেম্ব...
-
উদয়পুর শহর পরিক্রমা। 29শে ডিসেম্বর,2016. ভোর সাড়ে চারটের সময় আমরা উদয়পুর বাসস্ট্যান্ডে এসে বাস থেকে নামল...
-
রাজস্থান ভ্রমণ- দশম তথা অন্তিম পর্ব। জয়পুর শহর ভ্রমণ। 1st জানুয়ারি,2017. 1লা জানুয়ারি আমরা ঠিক 8:45-এ RTDC-র তীজ হোটেলে, আমাদের কবীর মার্গে...