Wednesday, 15 September 2021

রাজস্থান ভ্রমণ- দশম তথা অন্তিম পর্ব।

রাজস্থান ভ্রমণ- দশম তথা অন্তিম পর্ব।
জয়পুর শহর ভ্রমণ।
1st জানুয়ারি,2017.
1লা জানুয়ারি  আমরা ঠিক 8:45-এ RTDC-র তীজ হোটেলে, আমাদের কবীর মার্গে অবস্থিত  RDB হোটেল থেকে আমাদের এগারো নম্বর বাহনে চেপে প্রাতঃকালীন জয়পুর শহরের কর্মব্যস্ততা আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম। সকালবেলার এই হাঁটাটা খুব উপভোগ‍্য হয়েছিল। আমাদের বাসটিও ঠিক  সাড়ে আটটায় এসে পৌঁছেছিল।
1) আমাদের প্রথম দর্শনীয় স্থান ছিল বিড়লা মন্দির যেখানে লক্ষী-নারায়ণ পূজিত হচ্ছেন  আর শ্বেতশুভ্র মন্দিরটি মনের শান্তির সঙ্গে সঙ্গে চোখেরও শান্তি এনে দেয়।
আমাদের এই বাসের সফরটা সত্যি খুব মনোরম হয়েছিল। সফরসঙ্গী হিসাবে শুধু বিভিন্ন রাজ‍্যেরই নয় অন‍্য অন্য দেশের লোকজনের সঙ্গেও আলাপচারিতার সুযোগ হয়েছিল। আর গাইড ভদ্রলোক তো ভীষণ মিশুক ছিলেন আর দরকার মতো তথ্য -দিশা দেখাচ্ছিলেন। তবে  মাঝেমধ্যেই আমাদের অপেক্ষা করতে হচ্ছিল আমাদের এক জাপানি সহচরের জন্য। যিনি দলছুট হয়ে  এদিক -ওদিক দাঁড়িয়ে পড়ছিলেন আর গ্রুপের কিছুজন দৌড়াদৌড়ি করে  এদিক -সেদিক থেকে ধরে আনছিলেন। উনি জাপানি ভাষা আর ইংরেজিতে দু-দশটা শব্দের  ভরসায় ভারত ভ্রমণে এসেছেন। অবশেষে সময় আর দৌড়াদৌড়ির হাত থেকে বাঁচতে আমার স্বামী ভদ্রলোক ওনার  হাত ধরে চলা শুরু করলেন।                                        (আমাদের বাসের সহযাত্রী সকল।)
(আমাদের  সহযাত্রী জাপানি ভদ্রলোক,যিনি পেশায় একজন ইন্জিনিযার ছিলেন। ভারতে এসে প্রথমে তিনি গয়া,বুদ্ধগয়া দেখে অন‍্যান‍্য দ্রষ্টব‍্য জায়গাগুলো  ঘুরছেন।)                                      2) সরকারি মিউজিয়াম অ‍্যালবার্ট হলকে সামনে থেকে দর্শন করে  আমরা পিঙ্ক সিটি,পুরোনো জয়পুর শহরে প্রবেশ করে হাওয়া মহল দেখে (রাস্তা থেকে ) এগিয়ে চললাম।
        (সরকারি মিউজিয়াম অ‍্যালবার্ট হল।)                                (হাওয়া মহল।)                      রাজা Swawi জয় সিং 1726 সালে এই জয়পুর শহরের প্রতিষ্ঠা করেন।1876 সালে Prince of Wales  এর আগমনের আনন্দে এই শহরটিকে গোলাপি রঙে রাঙানো হয়। সেই থেকেই এই শহর পিঙ্ক সিটি নামে  প্রসিদ্ধ হয় আর সেই ট্র‍্যাডিশন্ এখনো চলছে।
3)হাওয়া মহল দেখে পৌঁছে গেলাম যন্তর-মন্তর। এটিও রাজা জয় সিং দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। তিনি একজন প্রখ্যাত জ‍্যোতিষশাস্ত্রবিদ হিসাবেও পরিচিত ছিলেন। আমাদের গাইড খুব সরলভাবে ছায়া পদ্ধতিতে সময়ের হিসেব রাখা,আহ্নিক গতি -বার্ষিক গতিতে ছায়ার অবস্থানের পরিবর্তন ইত্যাদি বুঝিয়ে দিলেন। দিল্লি  আগে যাওয়া হলেও  এই যন্তরমন্তরই আমার দেখা  প্রথম যন্তর-মন্তর।ছোট থেকে  ইতিহাস -ভূগোলের বইয়ে পড়া বিষয় চোখের সামনে মূর্ত হওয়ার এক অন্য ভালোলাগা।
                          (যন্তর-মন্তর।)                          4) সিটি প‍্যালেস ও মিউজিয়াম - এই সিটি প‍্যালেস 1727 সালে মহারাজা সোয়াই জয় সিংহ-2 জয়পুর শহর প্রতিষ্ঠার সময়ই তৈরী করেন।তার কোর্ট /সভা আমের থেকে জয়পুরে স্থানান্তর করেন।এখন এই প্রাসাদের কিছু অংশে মহারাজাসোয়াই মানসিংহ-2 এর মিউজিয়াম,কিছু অংশে রাজপরিবার বসবাস করে আর কিছু অংশ হোটেল হিসাবে  ব‍্যবহৃত হয়। কোচবিহারের রাজকন্যা ও জয়পুরের রাণী গায়ত্রীদেবীও বাস করেছেন।                                                         (ইনি আমাদের গাইড ছিলেন।)যন্তর-মন্তরের ঠিক পাশেই অবস্থিত এই প্রাসাদটিতে টিকিট কেটে  ঢুকে রাজা-রাজড়াদের মহার্ঘ‍্য পোশাক -পরিচ্ছদ- যেমন চোগা, ঘাঘরা,পোলো খেলার পোশাক ইত্যাদি দেখে যারপরনাই মুগ্ধ হয়ে তাদের অস্ত্র -সম্ভার দর্শনে ব‍্যস্ত হলাম। অস্ত্রের সংগ্রহ সত্যিই বিশাল ছিল। কিছু বন্দুক এত ভারী আর লম্বা ছিল যে এক একটা বন্দুক ধরতে দুজন মানুষের সাহায্য লাগত।
5) এরপর বাস থেকে বসে বসেই জলমহল দেখে আমের  ফোর্টের দিকে  এগিয়ে চললাম। রাজস্থানের প্রতিটি বিখ্যাত শহরেই একটি বড়ো লেক আছে আর জলমহল হল জয়পুরের সেই বড়ো লেক।
এইদিনটা ছিল 1st জানুয়ারি আর তার ওপর আবার রবিবার, 2017। রাস্তায় মানুষের ঢল নেমেছিল। বাস এগোতেই পারছেনা। আমাদের প্রথমে নাহারগড় দুর্গ দেখতে যাওয়ার কথা ছিল।ঘুরে ফিরে দুপুরে পেটপূজো করে ওখান থেকে জয়গড় দুর্গ যাওয়ার কথা। কিন্তু রাস্তায় জ‍্যাম থাকার দরুণ অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে অবশেষে নাহারগড় ও জয়গড় দুর্গ যাওয়ার প্ল‍্যান বাতিল করে আমের ফোর্টের দিকে বাস এগিয়ে চললো।
6) আমের ফোর্ট- মুঘল সম্রাট আকবরের প্রধান সেনাপতি মানসিংহের দুর্গ ছিল এইটি।এখানকার দিওয়ান-ই-আম, দিওয়ান-ই-খাস, শীশমহল খুব বিখ্যাত।                                 (পেছনে শীশমহল দেখা  যাচ্ছে।)                     দিওয়ান-ই-খাস
ছিল বিশিষ্ট  উৎসব পালন করার জায়গা আর দিওয়ান-ই-আমে প্রজারা তাদের অভাব -অভিযোগ নিয়ে এসে পৌঁছেতেন রাজার কাছে। শীশমহলের দেওয়াল-সিলিং তো সব ছোট ছোট কাঁচের সমাহারে তৈরী অপূর্ব দর্শনীয় বস্তু। আমাদের সাথী  গাইড মহাশয় এখানে স‍্যুটিং হওয়া বিভিন্ন সিনেমার নাম বলে  এই ফোর্টের সুন্দরতা আর মহত্ব বোঝাতে সচেষ্ট ছিলেন এবং গোটা বিষয়টায় বেশ উপভোগ‍্য ছিল। 
আমের ফোর্টে থাকাকালীনই সন্ধ্যা হয়ে  যাওয়ায় বিদ‍্যুতের আলোয় আলোকিত এক উঁচু টিলার উপর অবস্থিত আমের ফোর্টের এক অন্যরুপ আমাদের চোখে ধরা দিল।
আমাদের শেষ দ্রষ্টব‍্য স্থান ছিল কনক বৃন্দাবন উদ‍্যান। এখানে আলোকিত মন্দির  ও উদ‍্যান দেখে শুরু হল আমাদের ফেরার পালা।                     (কনক বৃন্দাবন উদ‍্যান।)                                বাসের জানালা দিয়ে আলোকোজ্জ্বল জয়পুর শহর   তথা আলোর মালা দিয়ে সাজানো জলমহল,হাওয়া মহল,অ‍্যালবার্ট হল এগুলিও দেখতে  পেলাম।
আসলে আলোকিত হাওয়া মহল,অ‍্যালবার্ট হল,জল মহল,আমের ফোর্ট ইত্যাদির যে  একটা  অন্যরূপ আছে তা দেখার জন্য সান্ধ্যকালীন ট‍্যুরেরও ব‍্যবস্থা আছে। সময়াভাবে আমাদের  এটা হচ্ছিল না কিন্তু 1st জানুয়ারি আনন্দে উদযাপনের ভীড়ের কারণে রাস্তার জ‍্যাম জয়গড় ও নাহারগড় দুর্গ দেখতে না দিলেও রাত্রের আলোকমালায় সজ্জিত ঐতিহাসিক সৌধগুলি দেখার সুযোগ করে দিল।
আজ আমাদের রাজস্থান ভ্রমণের শেষ দিন। আগামীকাল দিল্লী হয়ে কলকাতা ফিরে যাব। তারপর  আবার নিয়মমাফিক রোজকার জীবনযাত্রা শুরু হবে।জয়শলমীরের থর মরুভূমি ও সোনার কেল্লা, যোধপুরের মেহরানগড়, উদয়পুরের পিছোলা লেক, আজমেরের আজমের-শরীফ,পুষ্করের পুষ্কর লেক ও ব্রহ্মামন্দির, জয়পুরের হাওয়া মহল, যন্তরমন্তর ও রাজা মানসিংহের দুর্গ ইত্যাদি যা ইতিহাস বইয়ের পাতায় পড়েছি  অথবা সিনেমার পর্দায় দেখেছি তা চোখের সামনে   দেখাটা যেমন একদিকে স্বপ্নপূরণ তেমন অন‍্যদিকে খুব আনন্দদায়ক। এইবার ডিমানিটাইজেশনের জন্য প্লেনের টিকিট কাটতে গিয়ে প্রথমদিন অসুবিধায় পড়তে হয় ও দ্বিতীয়দিন এসে  একদিন পরের টিকিট  পায়। আমাদের ছুটি ছিল নির্দিষ্ট দশদিন তাই চিতোরগড়কে এ যাত্রায় দূরে রাখতে হয়। হয়তো ভালোয় হয়েছে  চিতোরের টানে  আবার হয়তো এপথে আসা হবে।

রাজস্থান ভ্রমণের নবম পর্ব।

রাজস্থান ভ্রমণ- নবম পর্ব।
আজমের শরীফ থেকে জয়পুর।
31st ডিসেম্বর,2016.
ভোর পাঁচটায়  হোটেল থেকে বেরিয়ে আজমের স্টেশনে এসে পৌঁছোলাম সাড়ে ছটার জয়পুর ইন্টারসিটি এক্সপ্রেস ধরার জন্য কিন্তু বিধি  বাম সেই ট্রেন এল সকাল নটায়। আমরা  জয়পুর পৌঁছালাম দুপুর বারোটায়। স্টেশনের কাছেই হোটেলের বুকিং থাকায় তাড়াতাড়ি স্নান -খাওয়া সেরে  দুপুরভ্রমণ করতে করতে  আবার  স্টেশনে এসে পৌঁছালাম RTDC থেকে  পরেরদিন জয়পুর ভ্রমণের( স্থানীয় দর্শনীয় স্থান ) টিকিট সংগ্রহ করতে।
      টিকিট সংগ্রহ হয়ে গেলে অটো  করে  আমরা  গেলাম  হাওয়া মহল দেখতে। RTDC-র ট‍্যুরে হাওয়া মহল বাইরে থেকে দেখায় ভেতরে ঢোকার সময় হয় না। হাওয়া মহলে হাওয়া খাওয়ার লক্ষ্যে টিকিট কেটে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে পৌঁছে গেলাম। এই মহল তৎকালীন জয়পুরের রাজা  1799 সালে পরিবারের মহিলা রা যাতে রাজপথে অনুষ্ঠিত পূজা-পার্বণ,শোভাযাত্রা ইত্যাদি দেখতে পারে  আর গরমের দিনে ঠাণ্ডা হাওয়া চলাচল করতে পারে তারজন‍্য বানিয়ে ছিলেন কারণ তখন পরিবারের মেয়ে-মহিলাদের মুখ না ঢেকে বাইরে বেরোবার অনুমতি ছিল না।
  এর পর এলাম হাওয়া মহল সংলগ্ন জহুরি বাজার।এই বাজারটি হাওয়া মহল সংলগ্ন রাস্তার দুইদিকে বিস্তৃত ও বেশ বড়ো। বাজারের জিনিসপত্র সব খুব পছন্দসই। আমার  তো মনে হচ্ছিল যেন সবকিছুই কিনে নিই।কতরকম রঙবেরঙের বাঁধনি কাজের শাড়ী,ওড়না,বিছানার চাদর। কাঁচ  বসানো রকমারী চুড়ি,নাগরা জুতো-চটি। আমি বেড়ানোর সাথে সময় পেলে  কেনাকাটাকেও  প্রাধান্য দিই।যতোই কলকাতায় সবকিছু  পাওয়া যাক না কেন একটু  দেখেশুনে কিনে  বাড়ীতে ফিরে যখন ওগুলো খোলা হয়,                      ( হাওয়া মহলের সামনে। )        তখন এক অন্যরকম অনুভূতি কাজ করে  আর কাছের মানুষজনকে উপহার দিতেও ভালো লাগে।আর  আমার ঠাকুমা-মাকেও দেখেছি এইরকম মোমেন্টো কিনে নিয়ে আসতে।যাইহোক বেশ খানিকক্ষণ এদিক -ওদিক ঘুরে দরদাম করে ছেলের  একটা পাঠানস‍্যুট, নিজের ও ছেলের কয়েক জোড়া জুতো আর বিভিন্নরকম চুড়ি,কানের দুল ইত্যাদি  কিনে রাতের আলোকোজ্জ্বল হাওয়া মহলের সামনে ছবি তুলে হোটেলে ফিরি।           (কেনাকাটায় ব‍্যস্ত আমি।)

Wednesday, 14 April 2021

রাজস্থান ভ্রমণ- অষ্টম পর্ব।

রাজস্থান ভ্রমণ - অষ্টম পর্ব।
30শে ডিসেম্বর,2016.
পুষ্কর পরিক্রমা।
     আজমের ভ্রমণে যে অটোদাদা আমাদের সঙ্গী ছিলেন,ওনাকে আজমের বাসস্ট্যান্ডে বিদায় জানিয়ে  স্থানীয় বাসে চেপে বসলাম 14 কিমি দূরে  অবস্থিত পুষ্কর যাওয়ার  জন্য।
  আরাবল্লী পর্বতমালার নাগপাহাড় আজমের থেকে পুষ্করকে আলাদা করেছে। এখানে  পৌঁছে প্রথমেই গেলাম পুষ্কর সরোবর।     ( পুষ্কর হ্রদে নামার এক ঘাট।)                 সরোবরের চারপাশ সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো আর সর্বমোট বাহান্নটি ঘাট আছে।(পুষ্করের বাহান্নটি ঘাটের এক ঘাট।)চারপাশে  মন্দিরের  সংখ্যা  প্রায় পাঁচশ 'র বেশি। কয়েকজন  বয়স্ক ব‍্যক্তি ঘাটের উপর বসে  গল্প গুজব করছিলেন দেখে নতুন কোনো তথ্যের বা গল্পের আশায় আমার পতিদেবও তাদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলেন আর তার শেষটা হলো  আমার  ছেলের মাধ্যমে আমাদের  পূর্বপুরুষদের পিণ্ডদান। ওনাদের কাছে সব রেডিমেড তৈরী থাকে  তাড়াতাড়ি সব ব‍্যবস্থা করে হয়ে গেল। (আমার ছেলের দাদু, ঠাকুর্দা ও অন‍্যান‍্য পূর্বপুরুষদের জল দান।)  এটা জানা ছিল যে স্নান, দান, তর্পণ, শ্রাদ্ধ, পারলৌকিক ক্রিয়া ইত্যাদিতে অক্ষয় ফল মেলে পুষ্করে কিন্তু  আমাদের  কোনো  পরিকল্পনা  ছিল না। অথচ কিভাবে সব হয়ে গেল। না ওনারা আমাদের থেকে অনেক টাকাপয়সাও কিছু দাবী করেননি অল্প কিছুই নিয়ে ছিলেন। এরপর ঘাটের ধারের আরো কিছু মন্দির ঘুরে  এসে পৌঁছালাম  ব্রহ্মা মন্দিরে। পূজোর ডালা নিয়ে  লাইনে বেশ খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে তারপর ভগবানজীর মূর্তির সাথে দেখা হলো।( ডালা নিয়ে ব্রহ্মামন্দিরে যাবার লাইনে দাঁড়িয়ে। )এই মন্দিরের পেছনেই ছিল বেদমাতা গায়ত্রীদেবীর মন্দির ও এক শিব মন্দির।    (বেদমাতা গায়ত্রীর মন্দির।)
(সিঁদুরে লাল রঙের ব্রহ্মামন্দিরে আমি ছেলের  সাথে।)
  (  ব্রহ্মামন্দিরে ঢোকার প্রবেশপথ।)    ভক্তিভরে প্রণাম করে বেড়িয়ে আমরা  এলাম  পুষ্করের উঁটের মেলার মাঠ। প্রতিবছর কার্তিক মাসের পূর্ণিমাতে এখানে পাঁচ দিন ধরে মেলা হয়। দূর -দূর থেকে বিক্রেতারা  এখানে উঁট নিয়ে বিক্রীর আশায় জমা হয়।      (সুসজ্জিত  উঁট ও উঁটের গাড়ি  সওয়ারীর অপেক্ষায়।)         এইসময় অনেক দেশী-বিদেশী পর্যটক  এই মেলা দেখে আনন্দ নিতে  আর পুষ্কর হ্রদে স্নান করে পুণ্য অর্জন করতে আসে।আমরা এখানে  হেঁটে হেঁটেই ঘুরছিলাম।  ব্রহ্মা মন্দিরে পূজার জন্য  আমরা  কেউই লান্চ করিনি টুকটাক মিষ্টি ফলমূল খেয়েই ছিলাম। এইবার  সকলের পেটে ইঁদুর লাফাতে শুরু করেছে তো আগে কিছু খেয়ে নেওয়া হলো। আমরা মেলার মাঠটি  পুরো একবার চক্কর দিলাম,কিছু সুন্দর ও সুসজ্জিত উটেরও দেখা পেলাম। আসলে এই মেলার কথা সংবাদপত্র, ম‍্যাগাজিন ও অন‍্য অনেক বই-এ অনেক  পড়েছি  তাই তার এক অন‍্য আকর্ষণ।  পুষ্করের দোকান থেকে স্মৃতি হিসাবে  কিছু  ওয়াল হ‍্যাংগিং,চাবির রিং ইত্যাদি কিনে  আজমের ফেরার বাস ধরার জন্য  রওনা দিলাম কারণ  দিনের আলো কমে আসছিল। আজমের ফিরে  খানিকক্ষণ  বিশ্রাম নিয়ে  রাতের খাবার  খেয়ে আবার বেরিয়ে ছিলাম।  সকালবেলায় দরগা যাওয়ার পথে  এই বাজারটার দোকান -পাট সব নজরে পড়ছিল কিন্তু সময়াভাবে আর যাওয়া হয়ে  ওঠে নি।রাত নটার সময় যখন  এই কথাটা  রিসেপসনে বলছিলাম  ওনারা  বল্লেন এখানে  দোকান  সারারাত ঘুমায় না। আপনারা  এখনো যেতে পারেন। ওনাদেরই একজন এসে কিছুটা  রাস্তা চিনিয়ে দিয়ে  ফিরে গেলেন। রঙবেরঙের চুড়ি, ওড়না, বাসনপত্র  সবকিছুই  খুব ভালো। হাঁটতে  হাঁটতে দরগার প্রবেশ পথের  সামনে অবধি গিয়েও রাত্রে  আর ঢোকার সাহস দেখাতে  পারলাম না। ঘড়ির কাঁটা  বারোর ঘর পার করে  গেছে  যদিও  বাজারে সন্ধ্যা ছটার ব‍্যস্ততা আমাদের হোটেলের দিকে  পা বাড়ানো  কাল সকালে  আমাদের  রাজস্থান ভ্রমণের সর্বশেষ  স্থান জয়পুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হবে।

Thursday, 8 April 2021

রাজস্থান ভ্রমণ-পঞ্চম পর্ব।

রাজস্থান ভ্রমণ - পঞ্চম পর্ব।যোধপুর শহর  পরিক্রমা।      28শে ডিসেম্বর  2016.     গতকাল রাত্রেই ফেরার সময় এক অটোচালক ভাইয়ের সাথে ঘোরার প্ল‍্যান হয়ে গেছিল। সকালে হোটেলের কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট করেই সাড়ে আটটা নাগাদ উমেদ ভবনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। যোধপুর শহরের প্রধান দ্রষ্টব‍্য স্থানগুলো হলো - উমেদ ভবন, মেহেরণ গড়, যশোবন্তধারা, মান্ডোর ও ঘন্টা  ঘর।                                      1) উমেদ ভবন  - 1929 সালে দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষদের কাজ দেওেয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে ইতালীয় শৈলীতে গোলাপি পাথরের এই প্রাসাদটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে 1942 সালে শেষ হয়। সেই সময়ের মহারাজ উমেদ সিংজীর নাম হিসাবে নাম হয় উমেদ ভবন। এখন 147টি ঘরের এই প্রাসাদের একভাগে  আছে  পাঁচতারা হেরিটেজ হোটেল, দ্বিতীয়ভাগে আছে  মিউজিয়াম  আর তৃতীয়ভাগে বাস করে  রাজপরিবার। মিউজিয়াম দেখার সময়  - সকাল নটা থেকে বিকেল পাঁচটা। প্রবেশ মূল‍্য ছিল - ত্রিশ টাকা। সোনায় মোড়া পৌরাণিক কাহিনী চিত্রিত দেওয়ান-ই-খাস,দেওয়ান-ই-আম, সিংহাসনের ঘর,বিভিন্ন রকম ঘড়ির সংগ্রহ -দেওয়াল ঘড়ি,টেবিল ঘড়ি,অস্ত্রশস্ত্র, আসবাবপত্র,পুরোনো মডেলের গাড়ি - সবই খুব ভালো লাগে।                       2 ) মেহেরণগড় - এটি 125 মিটার উঁচু গোদাগিরি টিলার  উপর অবস্থিত। 1459 খ্রীষ্টাব্দে মান্ডোর থেকে রাজ‍্যপাট তুলে  যোধা রাজ এখানে রাজধানী স্থাপন করেন। সাতটি বড়ো দরজা  পেরিয়ে গড়ে প্রবেশ করা গেল। পুরো গড়টায় মিউজিয়ামে  পরিবর্তিত হয়েছে। রুপোর হাওদা,পালকি,দোলনা, অস্ত্রশস্ত্র,বিলাস-ব‍্যসন -সবই তাদের শক্তি,ক্ষমতা আর ঐশ্বর্য‍্যের প্রতীক। ফুল মহলটি আশি কেজি সোনার পাত ও অন‍্যান‍্য দামী পাথর দিয়ে খুবই সুন্দরভাবে  অলংকৃত। দেওয়ান-ই-আম তথা মোতিমহলও খুব সুন্দর। সেখান থেকে বেড়িয়ে  আমরা গেলাম এই রাজাদের গৃহদেবতা চামুন্ডা দেবীর মন্দিরে। মন্দির থেকে বেড়িয়ে এলাম ক‍্যানন পয়েন্টে, অনেকগুলো কামান এখানে পরপর এমনভাবে সাজানো যেন সন্দেহজনক কিছু দেখলেই গোলা ছুঁড়বে। গড় থেকে  যোধপুর সত্যিই সুন্দর নীল শহর। গড়ের প্রবেশ মূল্য ছিল ষাট টাকা  আর ক‍্যামেরার জন্য একশটাকা।তবে প্রায় সবারই তো মোবাইল ফোন ক‍্যামেরাযুক্ত  তারজন‍্য কোনো অতিরিক্ত পয়সা লাগছিল না,এটাই বাঁচোয়া। আমরা অটোতে ফিরে এলে অটোচালক বলেছিলেন যে এই গড়ে আমরা বেশি সময় দিয়ে দিয়েছি। আমার  ছেলে  ওর বন্ধুদের সাথে লাইভ টেলিকাস্ট করতে গিয়ে  ফুলমহল ও মোতিমহলে খানিকটা দেরী করে পৌঁছায়। তার ফলে ঐ সুন্দর কারুকার্যমন্ডিত গড়/ রাজপ্রাসাদে আমরা একটু বেশী সময় ঘোরা  ও ছবি তোলার সুযোগ পেয়েছিলাম। 3) ফোর্ট থেকে বেড়িয়ে আমরা গিয়েছিলাম যশোবন্ত থাডা। দ্বিতীয়  যশোবন্ত সিং এর স্মৃতিরক্ষার্থে শ্বেত পাথর দিয়ে  এই সৌধটি তৈরী হয়। এই সৌধের সামনেই অবস্থিত  রাজপরিবারের শ্মশান। পৃথিবীর বুকে  অন্তিম শয‍্যা নেওয়ার স্থানগুলোতে মন্দিরের মতো করে  অনেক সৌধ গড়ে  উঠেছে।                4) মান্ডোর-  মান্ডোর হলো  পুরোনো  রাজধানী। মান্ডোর থেকে রাজপাট যোধপুরে এসে  বসে। এখানকার রাজপ্রাসাদের একদমই ভগ্নদশা। তবে  মিউজিয়ামটা খুব ভালো। অনেক সুন্দর সুন্দর খেলনা,স্পেশাল মজার  আয়না, বিভিন্নরকম ট্রেন ইন্জিনের ছোট মডেল, এই জিনিসগুলো খুব নজর কেড়ে ছিল। আর দেখেছিলাম এক বড়ো শিব মন্দির।  মন্দিরের আশেপাশে অনেক বাঁদর ছিল   আর এক ভদ্রলোক  বড় এক ডেকচি রুটি ও এক বস্তা কলা নিয়ে  গাছের তলায় বসেছিলেন। বাঁদরগুলো  একজন  একজন করে  শৃঙ্খলাবদ্ধ ভাবে রুটি ও কলা নিয়ে যেন লান্চ করতে যাচ্ছিল। আমরাও সেখান থেকে বেড়িয়ে খাবার জায়গা খুঁজতে লাগলাম কারণ পেটে তখন রীতিমতো ইঁদুর লাফাচ্ছে। অটোভাই এক ছোট হোটেলে নিয়ে গেল। দুজন  বয়স্ক ভদ্রলোক -ভদ্রমহিলা (স্বামী-স্ত্রী) হোটেলটি  চালায়। মেনু  ছিল রুটি, গাঁঠিয়ার সব্জী, ডাল-মাখানি আর লস‍্যি। সহজপাচ‍্য আর সুস্বাদু।  সেখান থেকে একটু দোকান -বাজার করার মন নিয়ে এলাম এক রাজস্থানী এম্পোরিয়ামে,কিন্তু দামে ছ‍্যাঁকা লাগায় কিছু না কিনেই  বেরিয়ে এলাম। পরবর্তী গন্তব্যস্থল হলো  ঘন্টাঘর।     5) এই ঘন্টা ঘর বা ক্লক টাওয়ারকে ঘিরে এক বড়ো  বাজার বসে। নানারকম জিনিসের সম্ভার। তারমধ‍্যে কাঁচের চুড়ি,লাক্ষার চুড়ি,মিনাকারী চুড়ি,ব্রেসলেট, কানের দুল,এমব্রয়ডারি করা  ড্রেস মেটেরিয়াল,চটি, জুতো  সবই মনে হচ্ছিল কিনে নিই। দামও যথেষ্ট ঠিকঠাক মনে  হওয়ায় ব‍্যগ খানিকটা ভর্তি করার ব‍্যবস্থা করা গেছিল।আমার কাছে বেড়ানোর  সাথে স্থানীয় প্রসিদ্ধ শিল্পসামগ্রী কেনাকাটা করাও একটা ভালোলাগার বিষয়। অটোভাইয়ের তাড়াতে বাজার থেকে বেরিয়ে এসে মনে হচ্ছিল   আর একটু থাকতে পারলে যেন ভালো হতো। কবিগুরু  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের  ছোটোগল্পের মতো -শেষ হয়েও হয়লো না শেষ। এরপর  হোটেলে ফিরে  একটু বিশ্রাম করে  জিনিসপত্র গুছিয়ে রাত আটটায় আবার পরের গন্তব্য উদয়পুরের বাস ধরার জন্য বেরিয়ে বাসস্ট্যান্ডে আসা।

রাজস্থান ভ্রমণ- দশম তথা অন্তিম পর্ব।

রাজস্থান ভ্রমণ- দশম তথা অন্তিম পর্ব। জয়পুর শহর ভ্রমণ। 1st জানুয়ারি,2017. 1লা জানুয়ারি  আমরা ঠিক 8:45-এ RTDC-র তীজ হোটেলে, আমাদের কবীর মার্গে...