Wednesday, 15 September 2021

রাজস্থান ভ্রমণ- দশম তথা অন্তিম পর্ব।

রাজস্থান ভ্রমণ- দশম তথা অন্তিম পর্ব।
জয়পুর শহর ভ্রমণ।
1st জানুয়ারি,2017.
1লা জানুয়ারি  আমরা ঠিক 8:45-এ RTDC-র তীজ হোটেলে, আমাদের কবীর মার্গে অবস্থিত  RDB হোটেল থেকে আমাদের এগারো নম্বর বাহনে চেপে প্রাতঃকালীন জয়পুর শহরের কর্মব্যস্ততা আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম। সকালবেলার এই হাঁটাটা খুব উপভোগ‍্য হয়েছিল। আমাদের বাসটিও ঠিক  সাড়ে আটটায় এসে পৌঁছেছিল।
1) আমাদের প্রথম দর্শনীয় স্থান ছিল বিড়লা মন্দির যেখানে লক্ষী-নারায়ণ পূজিত হচ্ছেন  আর শ্বেতশুভ্র মন্দিরটি মনের শান্তির সঙ্গে সঙ্গে চোখেরও শান্তি এনে দেয়।
আমাদের এই বাসের সফরটা সত্যি খুব মনোরম হয়েছিল। সফরসঙ্গী হিসাবে শুধু বিভিন্ন রাজ‍্যেরই নয় অন‍্য অন্য দেশের লোকজনের সঙ্গেও আলাপচারিতার সুযোগ হয়েছিল। আর গাইড ভদ্রলোক তো ভীষণ মিশুক ছিলেন আর দরকার মতো তথ্য -দিশা দেখাচ্ছিলেন। তবে  মাঝেমধ্যেই আমাদের অপেক্ষা করতে হচ্ছিল আমাদের এক জাপানি সহচরের জন্য। যিনি দলছুট হয়ে  এদিক -ওদিক দাঁড়িয়ে পড়ছিলেন আর গ্রুপের কিছুজন দৌড়াদৌড়ি করে  এদিক -সেদিক থেকে ধরে আনছিলেন। উনি জাপানি ভাষা আর ইংরেজিতে দু-দশটা শব্দের  ভরসায় ভারত ভ্রমণে এসেছেন। অবশেষে সময় আর দৌড়াদৌড়ির হাত থেকে বাঁচতে আমার স্বামী ভদ্রলোক ওনার  হাত ধরে চলা শুরু করলেন।                                        (আমাদের বাসের সহযাত্রী সকল।)
(আমাদের  সহযাত্রী জাপানি ভদ্রলোক,যিনি পেশায় একজন ইন্জিনিযার ছিলেন। ভারতে এসে প্রথমে তিনি গয়া,বুদ্ধগয়া দেখে অন‍্যান‍্য দ্রষ্টব‍্য জায়গাগুলো  ঘুরছেন।)                                      2) সরকারি মিউজিয়াম অ‍্যালবার্ট হলকে সামনে থেকে দর্শন করে  আমরা পিঙ্ক সিটি,পুরোনো জয়পুর শহরে প্রবেশ করে হাওয়া মহল দেখে (রাস্তা থেকে ) এগিয়ে চললাম।
        (সরকারি মিউজিয়াম অ‍্যালবার্ট হল।)                                (হাওয়া মহল।)                      রাজা Swawi জয় সিং 1726 সালে এই জয়পুর শহরের প্রতিষ্ঠা করেন।1876 সালে Prince of Wales  এর আগমনের আনন্দে এই শহরটিকে গোলাপি রঙে রাঙানো হয়। সেই থেকেই এই শহর পিঙ্ক সিটি নামে  প্রসিদ্ধ হয় আর সেই ট্র‍্যাডিশন্ এখনো চলছে।
3)হাওয়া মহল দেখে পৌঁছে গেলাম যন্তর-মন্তর। এটিও রাজা জয় সিং দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। তিনি একজন প্রখ্যাত জ‍্যোতিষশাস্ত্রবিদ হিসাবেও পরিচিত ছিলেন। আমাদের গাইড খুব সরলভাবে ছায়া পদ্ধতিতে সময়ের হিসেব রাখা,আহ্নিক গতি -বার্ষিক গতিতে ছায়ার অবস্থানের পরিবর্তন ইত্যাদি বুঝিয়ে দিলেন। দিল্লি  আগে যাওয়া হলেও  এই যন্তরমন্তরই আমার দেখা  প্রথম যন্তর-মন্তর।ছোট থেকে  ইতিহাস -ভূগোলের বইয়ে পড়া বিষয় চোখের সামনে মূর্ত হওয়ার এক অন্য ভালোলাগা।
                          (যন্তর-মন্তর।)                          4) সিটি প‍্যালেস ও মিউজিয়াম - এই সিটি প‍্যালেস 1727 সালে মহারাজা সোয়াই জয় সিংহ-2 জয়পুর শহর প্রতিষ্ঠার সময়ই তৈরী করেন।তার কোর্ট /সভা আমের থেকে জয়পুরে স্থানান্তর করেন।এখন এই প্রাসাদের কিছু অংশে মহারাজাসোয়াই মানসিংহ-2 এর মিউজিয়াম,কিছু অংশে রাজপরিবার বসবাস করে আর কিছু অংশ হোটেল হিসাবে  ব‍্যবহৃত হয়। কোচবিহারের রাজকন্যা ও জয়পুরের রাণী গায়ত্রীদেবীও বাস করেছেন।                                                         (ইনি আমাদের গাইড ছিলেন।)যন্তর-মন্তরের ঠিক পাশেই অবস্থিত এই প্রাসাদটিতে টিকিট কেটে  ঢুকে রাজা-রাজড়াদের মহার্ঘ‍্য পোশাক -পরিচ্ছদ- যেমন চোগা, ঘাঘরা,পোলো খেলার পোশাক ইত্যাদি দেখে যারপরনাই মুগ্ধ হয়ে তাদের অস্ত্র -সম্ভার দর্শনে ব‍্যস্ত হলাম। অস্ত্রের সংগ্রহ সত্যিই বিশাল ছিল। কিছু বন্দুক এত ভারী আর লম্বা ছিল যে এক একটা বন্দুক ধরতে দুজন মানুষের সাহায্য লাগত।
5) এরপর বাস থেকে বসে বসেই জলমহল দেখে আমের  ফোর্টের দিকে  এগিয়ে চললাম। রাজস্থানের প্রতিটি বিখ্যাত শহরেই একটি বড়ো লেক আছে আর জলমহল হল জয়পুরের সেই বড়ো লেক।
এইদিনটা ছিল 1st জানুয়ারি আর তার ওপর আবার রবিবার, 2017। রাস্তায় মানুষের ঢল নেমেছিল। বাস এগোতেই পারছেনা। আমাদের প্রথমে নাহারগড় দুর্গ দেখতে যাওয়ার কথা ছিল।ঘুরে ফিরে দুপুরে পেটপূজো করে ওখান থেকে জয়গড় দুর্গ যাওয়ার কথা। কিন্তু রাস্তায় জ‍্যাম থাকার দরুণ অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে অবশেষে নাহারগড় ও জয়গড় দুর্গ যাওয়ার প্ল‍্যান বাতিল করে আমের ফোর্টের দিকে বাস এগিয়ে চললো।
6) আমের ফোর্ট- মুঘল সম্রাট আকবরের প্রধান সেনাপতি মানসিংহের দুর্গ ছিল এইটি।এখানকার দিওয়ান-ই-আম, দিওয়ান-ই-খাস, শীশমহল খুব বিখ্যাত।                                 (পেছনে শীশমহল দেখা  যাচ্ছে।)                     দিওয়ান-ই-খাস
ছিল বিশিষ্ট  উৎসব পালন করার জায়গা আর দিওয়ান-ই-আমে প্রজারা তাদের অভাব -অভিযোগ নিয়ে এসে পৌঁছেতেন রাজার কাছে। শীশমহলের দেওয়াল-সিলিং তো সব ছোট ছোট কাঁচের সমাহারে তৈরী অপূর্ব দর্শনীয় বস্তু। আমাদের সাথী  গাইড মহাশয় এখানে স‍্যুটিং হওয়া বিভিন্ন সিনেমার নাম বলে  এই ফোর্টের সুন্দরতা আর মহত্ব বোঝাতে সচেষ্ট ছিলেন এবং গোটা বিষয়টায় বেশ উপভোগ‍্য ছিল। 
আমের ফোর্টে থাকাকালীনই সন্ধ্যা হয়ে  যাওয়ায় বিদ‍্যুতের আলোয় আলোকিত এক উঁচু টিলার উপর অবস্থিত আমের ফোর্টের এক অন্যরুপ আমাদের চোখে ধরা দিল।
আমাদের শেষ দ্রষ্টব‍্য স্থান ছিল কনক বৃন্দাবন উদ‍্যান। এখানে আলোকিত মন্দির  ও উদ‍্যান দেখে শুরু হল আমাদের ফেরার পালা।                     (কনক বৃন্দাবন উদ‍্যান।)                                বাসের জানালা দিয়ে আলোকোজ্জ্বল জয়পুর শহর   তথা আলোর মালা দিয়ে সাজানো জলমহল,হাওয়া মহল,অ‍্যালবার্ট হল এগুলিও দেখতে  পেলাম।
আসলে আলোকিত হাওয়া মহল,অ‍্যালবার্ট হল,জল মহল,আমের ফোর্ট ইত্যাদির যে  একটা  অন্যরূপ আছে তা দেখার জন্য সান্ধ্যকালীন ট‍্যুরেরও ব‍্যবস্থা আছে। সময়াভাবে আমাদের  এটা হচ্ছিল না কিন্তু 1st জানুয়ারি আনন্দে উদযাপনের ভীড়ের কারণে রাস্তার জ‍্যাম জয়গড় ও নাহারগড় দুর্গ দেখতে না দিলেও রাত্রের আলোকমালায় সজ্জিত ঐতিহাসিক সৌধগুলি দেখার সুযোগ করে দিল।
আজ আমাদের রাজস্থান ভ্রমণের শেষ দিন। আগামীকাল দিল্লী হয়ে কলকাতা ফিরে যাব। তারপর  আবার নিয়মমাফিক রোজকার জীবনযাত্রা শুরু হবে।জয়শলমীরের থর মরুভূমি ও সোনার কেল্লা, যোধপুরের মেহরানগড়, উদয়পুরের পিছোলা লেক, আজমেরের আজমের-শরীফ,পুষ্করের পুষ্কর লেক ও ব্রহ্মামন্দির, জয়পুরের হাওয়া মহল, যন্তরমন্তর ও রাজা মানসিংহের দুর্গ ইত্যাদি যা ইতিহাস বইয়ের পাতায় পড়েছি  অথবা সিনেমার পর্দায় দেখেছি তা চোখের সামনে   দেখাটা যেমন একদিকে স্বপ্নপূরণ তেমন অন‍্যদিকে খুব আনন্দদায়ক। এইবার ডিমানিটাইজেশনের জন্য প্লেনের টিকিট কাটতে গিয়ে প্রথমদিন অসুবিধায় পড়তে হয় ও দ্বিতীয়দিন এসে  একদিন পরের টিকিট  পায়। আমাদের ছুটি ছিল নির্দিষ্ট দশদিন তাই চিতোরগড়কে এ যাত্রায় দূরে রাখতে হয়। হয়তো ভালোয় হয়েছে  চিতোরের টানে  আবার হয়তো এপথে আসা হবে।

No comments:

Post a Comment

রাজস্থান ভ্রমণ- দশম তথা অন্তিম পর্ব।

রাজস্থান ভ্রমণ- দশম তথা অন্তিম পর্ব। জয়পুর শহর ভ্রমণ। 1st জানুয়ারি,2017. 1লা জানুয়ারি  আমরা ঠিক 8:45-এ RTDC-র তীজ হোটেলে, আমাদের কবীর মার্গে...