(বালির ওপরে এই বড়ো পোকার দরুণ মূর্ত হওয়া ডিজাইন।) ২৬শে ডিসেম্বর দুপুর তিনটের সময় ব্যাগপত্র গাড়ীতে তুলে জয়সলমীর শহর থেকে ৪০কিমি দূরে অবস্থিত স্যাম ডিউন,মরুভূমি দেখতে ও রাত্রিযাপন করতে রওয়ানা দিলাম।মরুভূমির বুক চিরে ঝাঁ চকচকে পীচের মসৃন রাস্তা পাকিস্তানের বর্ডার অবধি গিয়েছে।দুধারে যতদূর চোখ যায় শুধু ধূ ধূ বালি,শুকনো ঘাস,বাবলা গাছ আরো বিভিন্ন রকম কাঁটাগাছের ঝোপ।জনবসতি খুব কম।রাস্তার দুই ধার মিলে গোটা চারেক গ্রামের দেখা পেয়েছিলাম। আমাদের পশ্চিমবঙ্গের রাস্তার দুইধারের সবুজ ধানক্ষেত আর সরকারের পক্ষ থেকে লাগানো বড়ো বড়ো বৃক্ষরাজির ছায়া থেকে সম্পূর্ণ ভাবে পৃথক। বিকেল ৩ টে ৪৫ এ আমাদের গন্তব্য সাম ডিউনে পৌঁছে গেলাম।জিনিস পত্র গাড়ীর মধ্যে রেখে ট্রাভেল এজেন্টের নির্দিষ্ট করে রাখা উটের পিঠে চেপে মরুভূমির মধ্যে সূর্যাস্ত দেখার পয়েন্টে এসে পৌছোলাম।প্রথম উটের পীঠে চড়ার অভিজ্ঞতা, আমার তো বেশ ভয় করছিল,আমার পতিদেবতাটি অবশ্য অভয় দিচ্ছিল যে পড়লে তো বালির উপর পড়ব তাই ব্যথা লাগবে না।আমার ছেলে অবশ্য আর একবার উটের পীঠে উঠে মরুভূমির মধ্যে দূর থেকে ঘুরে এলেও আমি আর সাহস দেখাই নি।তবে এই জায়গাটা আমার খুব নোংরা লেগেছে, পর্যটকদের আর একটু সচেতনতার দরকার।এখান থেকে পাকিস্তান বর্ডার ১২০কিলোমিটার দূরে। মরুভূমিতে সূর্যাস্ত দেখার এক অনন্য অভিজ্ঞতা নিয়ে ও অনেক ছবি তুলে আমাদের টেন্ট হাউসে ফিরে আসি। প্রবেশ পথে রাজস্থানী ট্র্যাডিশনাল পোশাকে সজ্জিত একজন কপালে টীকা লাগিয়ে অভ্যর্থনা জানায়।মরুভূমি থেকে ফেরার সময় দেখলাম অনেকগুলো এজেন্সির এইরকম টেন্টহাউস আছে।ভাড়া হিসেবে তাদের ব্যবস্থাপত্র আলাদা আলাদা।সূর্যের আলো কমে যেতেই চারিদিক রঙবেরঙের বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠলো ও তারসঙ্গে কান ঝালাপালা করা ডিজের আওয়াজ।তবে সন্ধ্যায় স্থানীয় শিল্পীদের সহায়তায় খুব সুন্দর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।অনুষ্ঠানের জায়গাটাও খুব ভালো ছিল।ওই ঠান্ডায় খোলা আকাশের নীচে গোল করে কার্পেট পেতে পেছনে মোটা মোটা তাকিয়া রেখে পর্যটকদের বসার জায়গা তৈরী করেছিল, কিছু চেয়ারও রাখা ছিল।মাঝখানে আবার কাঠের আগুন জ্বলছিল।স্কাউট অনুষ্ঠানের ক্যাম্প ফায়ারের কথা মনে পড়িয়ে দিচ্ছিল।ঠিক সন্ধ্যা সাতটায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের শুরু। প্রথমে জনপ্রিয় রাজস্থানী গান ও তারপর হিন্দী গান,বিশেষতঃ যেগুলো রাজস্থানী ঘরানার গান খুব সুন্দর ভাবে পরিবেশন করেছিল।নিমুরা, নিমুরা, নিমুরা......... ও হম তো ঠহরে পরদেশী...... এই গান দুটো তো মনে হয় এখনো কানে লেগে আছে। এরপর বলতে হয় দুই কালবেলিয়া নৃত্যশিল্পীর কথা।তারা বিভিন্ন প্রপ যথা হাঁড়ি,ব্লেড…ইত্যাদি নিয়ে খুব সুন্দর অনেক গুলি নাচ প্রদর্শন করে।তারপর তারা দর্শকদের ও তাদের প্রতিভা দর্শন করিয়ে আনন্দ নেবার জন্য আহ্বান জানাচ্ছিল।অনেকেই ফিল্ডে নেমে পড়ায় এক হরিবল অবস্থার সৃষ্টি হয়।রাত নটায় দুই বাস পর্যটক রাতে জয়শলমীর শহরে থাকার জন্য ফিরে যাওয়ায় ভীড় কম হলে আমিও কিছুক্ষণ ওদের সাথে তাল মিলিয়ে আনন্দ নিতে চেষ্টা করি।এরমধ্যে আমাদের রাতের খাবারের জন্য ডাক পড়ে।একদম ট্রাডিশনাল রাজস্থানী খাবার পরিবেশন করে।খুব সুস্বাদু না লাগলেও পেট ভরে খেয়ে টেন্ট হাউসে ফিরে যায়।এবার একটু টেন্ট হাউসের সম্পর্কে বলি।এর দেওয়ালগুলো মোটা কাপড়ের তৈরী হলেও মেঝে সিমেন্টের ।টয়লেটের মেঝেতে তো সুদৃশ্য টাইলস লাগানো এবং কোমড,ওয়াশ বেসিন, ওয়াটার সাপ্লাই সবই ঠিক ছিল।বড়ো খাট,সাইড টেবিল,টেবিল ল্যাম্প,নরমগদি, খুব ঠান্ডা হয় বলে কম্বলটাও ছিল খুব মোটা ও নরম। যেন কোনো হোটেলের সুসজ্জিত রুম। আমার এক কলিগ বলেছিলেন যে তারা ঠান্ডার জন্য রাতে টেন্টে না থেকে জয়শলমীর ফিরে এসে আবার হোটেল বুক করে ছিলো।2016র ডিসেম্বরে সেইরকম ঠান্ডা পড়ে নি আর আমাদের কোনো অসুবিধা হয়নি।যাইহোক, অনেক দিনের এক সখ মরুভূমিতে রাত কাটানোর সেটা পূর্ণ হলো।
আমি ঘুরতে খুব ভালোবাসি। এটা আমার বাবার কাছ থেকে বোধ হয় উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। বাবা ,প্রায় প্রতি বছর দুর্গাপুজোর সময় অথবা বার্ষিক পরীক্ষার শেষে ডিসেম্বর মাসে কখনো কাছে পিঠে কোথাও ,কখনো বা দূরের কোনো রাজ্যের জায়গা গুলি ঘোরাতে নিয়ে যেতেন। বিয়ের পর আমার স্বামীরও বদলির চাকরি হওয়াতে বিভিন্ন জায়গায় ঘোরার সুযোগ পেয়েছি। আমি সেগুলিকে এখানে পর্যায়ক্রমে চিত্র সহযোগে লিখতে চলেছি। যাতে পাঠক কুলও এই জায়গা সম্বন্ধে জানতে পারেন এবং এই জায়গার বিভিন্ন দর্শনীয় জায়গা দেখার আনন্দ উপভোগ করতে পারেন।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
রাজস্থান ভ্রমণ- দশম তথা অন্তিম পর্ব।
রাজস্থান ভ্রমণ- দশম তথা অন্তিম পর্ব। জয়পুর শহর ভ্রমণ। 1st জানুয়ারি,2017. 1লা জানুয়ারি আমরা ঠিক 8:45-এ RTDC-র তীজ হোটেলে, আমাদের কবীর মার্গে...
-
তৃতীয় পর্ব। (বালির ওপরে এই বড়ো পোকার দরুণ মূর্ত হওয়া ডিজাইন।) ২৬শে ডিসেম্ব...
-
উদয়পুর শহর পরিক্রমা। 29শে ডিসেম্বর,2016. ভোর সাড়ে চারটের সময় আমরা উদয়পুর বাসস্ট্যান্ডে এসে বাস থেকে নামল...
-
রাজস্থান ভ্রমণ- দশম তথা অন্তিম পর্ব। জয়পুর শহর ভ্রমণ। 1st জানুয়ারি,2017. 1লা জানুয়ারি আমরা ঠিক 8:45-এ RTDC-র তীজ হোটেলে, আমাদের কবীর মার্গে...
Khub bhalo laglo
ReplyDelete