আমি ঘুরতে খুব ভালোবাসি। এটা আমার বাবার কাছ থেকে বোধ হয় উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। বাবা ,প্রায় প্রতি বছর দুর্গাপুজোর সময় অথবা বার্ষিক পরীক্ষার শেষে ডিসেম্বর মাসে কখনো কাছে পিঠে কোথাও ,কখনো বা দূরের কোনো রাজ্যের জায়গা গুলি ঘোরাতে নিয়ে যেতেন। বিয়ের পর আমার স্বামীরও বদলির চাকরি হওয়াতে বিভিন্ন জায়গায় ঘোরার সুযোগ পেয়েছি। আমি সেগুলিকে এখানে পর্যায়ক্রমে চিত্র সহযোগে লিখতে চলেছি। যাতে পাঠক কুলও এই জায়গা সম্বন্ধে জানতে পারেন এবং এই জায়গার বিভিন্ন দর্শনীয় জায়গা দেখার আনন্দ উপভোগ করতে পারেন।
Thursday, 8 April 2021
রাজস্থান ভ্রমণ-পঞ্চম পর্ব।
রাজস্থান ভ্রমণ - পঞ্চম পর্ব।যোধপুর শহর পরিক্রমা। 28শে ডিসেম্বর 2016. গতকাল রাত্রেই ফেরার সময় এক অটোচালক ভাইয়ের সাথে ঘোরার প্ল্যান হয়ে গেছিল। সকালে হোটেলের কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট করেই সাড়ে আটটা নাগাদ উমেদ ভবনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। যোধপুর শহরের প্রধান দ্রষ্টব্য স্থানগুলো হলো - উমেদ ভবন, মেহেরণ গড়, যশোবন্তধারা, মান্ডোর ও ঘন্টা ঘর। 1) উমেদ ভবন - 1929 সালে দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষদের কাজ দেওেয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে ইতালীয় শৈলীতে গোলাপি পাথরের এই প্রাসাদটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে 1942 সালে শেষ হয়। সেই সময়ের মহারাজ উমেদ সিংজীর নাম হিসাবে নাম হয় উমেদ ভবন। এখন 147টি ঘরের এই প্রাসাদের একভাগে আছে পাঁচতারা হেরিটেজ হোটেল, দ্বিতীয়ভাগে আছে মিউজিয়াম আর তৃতীয়ভাগে বাস করে রাজপরিবার। মিউজিয়াম দেখার সময় - সকাল নটা থেকে বিকেল পাঁচটা। প্রবেশ মূল্য ছিল - ত্রিশ টাকা। সোনায় মোড়া পৌরাণিক কাহিনী চিত্রিত দেওয়ান-ই-খাস,দেওয়ান-ই-আম, সিংহাসনের ঘর,বিভিন্ন রকম ঘড়ির সংগ্রহ -দেওয়াল ঘড়ি,টেবিল ঘড়ি,অস্ত্রশস্ত্র, আসবাবপত্র,পুরোনো মডেলের গাড়ি - সবই খুব ভালো লাগে। 2 ) মেহেরণগড় - এটি 125 মিটার উঁচু গোদাগিরি টিলার উপর অবস্থিত। 1459 খ্রীষ্টাব্দে মান্ডোর থেকে রাজ্যপাট তুলে যোধা রাজ এখানে রাজধানী স্থাপন করেন। সাতটি বড়ো দরজা পেরিয়ে গড়ে প্রবেশ করা গেল। পুরো গড়টায় মিউজিয়ামে পরিবর্তিত হয়েছে। রুপোর হাওদা,পালকি,দোলনা, অস্ত্রশস্ত্র,বিলাস-ব্যসন -সবই তাদের শক্তি,ক্ষমতা আর ঐশ্বর্য্যের প্রতীক। ফুল মহলটি আশি কেজি সোনার পাত ও অন্যান্য দামী পাথর দিয়ে খুবই সুন্দরভাবে অলংকৃত। দেওয়ান-ই-আম তথা মোতিমহলও খুব সুন্দর। সেখান থেকে বেড়িয়ে আমরা গেলাম এই রাজাদের গৃহদেবতা চামুন্ডা দেবীর মন্দিরে। মন্দির থেকে বেড়িয়ে এলাম ক্যানন পয়েন্টে, অনেকগুলো কামান এখানে পরপর এমনভাবে সাজানো যেন সন্দেহজনক কিছু দেখলেই গোলা ছুঁড়বে। গড় থেকে যোধপুর সত্যিই সুন্দর নীল শহর। গড়ের প্রবেশ মূল্য ছিল ষাট টাকা আর ক্যামেরার জন্য একশটাকা।তবে প্রায় সবারই তো মোবাইল ফোন ক্যামেরাযুক্ত তারজন্য কোনো অতিরিক্ত পয়সা লাগছিল না,এটাই বাঁচোয়া। আমরা অটোতে ফিরে এলে অটোচালক বলেছিলেন যে এই গড়ে আমরা বেশি সময় দিয়ে দিয়েছি। আমার ছেলে ওর বন্ধুদের সাথে লাইভ টেলিকাস্ট করতে গিয়ে ফুলমহল ও মোতিমহলে খানিকটা দেরী করে পৌঁছায়। তার ফলে ঐ সুন্দর কারুকার্যমন্ডিত গড়/ রাজপ্রাসাদে আমরা একটু বেশী সময় ঘোরা ও ছবি তোলার সুযোগ পেয়েছিলাম। 3) ফোর্ট থেকে বেড়িয়ে আমরা গিয়েছিলাম যশোবন্ত থাডা। দ্বিতীয় যশোবন্ত সিং এর স্মৃতিরক্ষার্থে শ্বেত পাথর দিয়ে এই সৌধটি তৈরী হয়। এই সৌধের সামনেই অবস্থিত রাজপরিবারের শ্মশান। পৃথিবীর বুকে অন্তিম শয্যা নেওয়ার স্থানগুলোতে মন্দিরের মতো করে অনেক সৌধ গড়ে উঠেছে। 4) মান্ডোর- মান্ডোর হলো পুরোনো রাজধানী। মান্ডোর থেকে রাজপাট যোধপুরে এসে বসে। এখানকার রাজপ্রাসাদের একদমই ভগ্নদশা। তবে মিউজিয়ামটা খুব ভালো। অনেক সুন্দর সুন্দর খেলনা,স্পেশাল মজার আয়না, বিভিন্নরকম ট্রেন ইন্জিনের ছোট মডেল, এই জিনিসগুলো খুব নজর কেড়ে ছিল। আর দেখেছিলাম এক বড়ো শিব মন্দির। মন্দিরের আশেপাশে অনেক বাঁদর ছিল আর এক ভদ্রলোক বড় এক ডেকচি রুটি ও এক বস্তা কলা নিয়ে গাছের তলায় বসেছিলেন। বাঁদরগুলো একজন একজন করে শৃঙ্খলাবদ্ধ ভাবে রুটি ও কলা নিয়ে যেন লান্চ করতে যাচ্ছিল। আমরাও সেখান থেকে বেড়িয়ে খাবার জায়গা খুঁজতে লাগলাম কারণ পেটে তখন রীতিমতো ইঁদুর লাফাচ্ছে। অটোভাই এক ছোট হোটেলে নিয়ে গেল। দুজন বয়স্ক ভদ্রলোক -ভদ্রমহিলা (স্বামী-স্ত্রী) হোটেলটি চালায়। মেনু ছিল রুটি, গাঁঠিয়ার সব্জী, ডাল-মাখানি আর লস্যি। সহজপাচ্য আর সুস্বাদু। সেখান থেকে একটু দোকান -বাজার করার মন নিয়ে এলাম এক রাজস্থানী এম্পোরিয়ামে,কিন্তু দামে ছ্যাঁকা লাগায় কিছু না কিনেই বেরিয়ে এলাম। পরবর্তী গন্তব্যস্থল হলো ঘন্টাঘর। 5) এই ঘন্টা ঘর বা ক্লক টাওয়ারকে ঘিরে এক বড়ো বাজার বসে। নানারকম জিনিসের সম্ভার। তারমধ্যে কাঁচের চুড়ি,লাক্ষার চুড়ি,মিনাকারী চুড়ি,ব্রেসলেট, কানের দুল,এমব্রয়ডারি করা ড্রেস মেটেরিয়াল,চটি, জুতো সবই মনে হচ্ছিল কিনে নিই। দামও যথেষ্ট ঠিকঠাক মনে হওয়ায় ব্যগ খানিকটা ভর্তি করার ব্যবস্থা করা গেছিল।আমার কাছে বেড়ানোর সাথে স্থানীয় প্রসিদ্ধ শিল্পসামগ্রী কেনাকাটা করাও একটা ভালোলাগার বিষয়। অটোভাইয়ের তাড়াতে বাজার থেকে বেরিয়ে এসে মনে হচ্ছিল আর একটু থাকতে পারলে যেন ভালো হতো। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্পের মতো -শেষ হয়েও হয়লো না শেষ। এরপর হোটেলে ফিরে একটু বিশ্রাম করে জিনিসপত্র গুছিয়ে রাত আটটায় আবার পরের গন্তব্য উদয়পুরের বাস ধরার জন্য বেরিয়ে বাসস্ট্যান্ডে আসা।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
রাজস্থান ভ্রমণ- দশম তথা অন্তিম পর্ব।
রাজস্থান ভ্রমণ- দশম তথা অন্তিম পর্ব। জয়পুর শহর ভ্রমণ। 1st জানুয়ারি,2017. 1লা জানুয়ারি আমরা ঠিক 8:45-এ RTDC-র তীজ হোটেলে, আমাদের কবীর মার্গে...
-
তৃতীয় পর্ব। (বালির ওপরে এই বড়ো পোকার দরুণ মূর্ত হওয়া ডিজাইন।) ২৬শে ডিসেম্ব...
-
উদয়পুর শহর পরিক্রমা। 29শে ডিসেম্বর,2016. ভোর সাড়ে চারটের সময় আমরা উদয়পুর বাসস্ট্যান্ডে এসে বাস থেকে নামল...
-
রাজস্থান ভ্রমণ- দশম তথা অন্তিম পর্ব। জয়পুর শহর ভ্রমণ। 1st জানুয়ারি,2017. 1লা জানুয়ারি আমরা ঠিক 8:45-এ RTDC-র তীজ হোটেলে, আমাদের কবীর মার্গে...
No comments:
Post a Comment